সিস্টেমের হার মানা এক ট্র্যাজেডি : ব্যাঙ্কে মৃত বোনের কঙ্কাল নিয়ে হাজির জিতু মুন্ডা
সভ্যতা যখন মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখছে, তখন একবিংশ শতাব্দীর এক মর্মান্তিক ও বীভৎস ছবি আমাদের স্তম্ভিত করে দিল। মৃত বোনের অ্যাকাউন্টে জমা থাকা মাত্র ২০ হাজার টাকা তুলতে বারবার ব্যর্থ হয়ে, শেষমেশ কবর খুঁড়ে বোনের কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে ব্যাঙ্কে হাজির হলেন ওড়িশার এক নিরুপায় ভাই, জিতু মুন্ডা। এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের বর্তমান ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার চরম সংবেদনহীন ব্যবস্থাপনার এক নগ্ন চিত্র। এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বিত্তবান, ক্ষমতাবানদের জন্য নিয়ম নমনীয় এবং যেকোনো কাজ দ্রুত হয়ে যায়। অথচ গরিব, আদিবাসী বা প্রান্তিক মানুষের ক্ষেত্রে সেই একই নিয়মই হয়ে ওঠে কঠিন, কঠোর এবং অলঙ্ঘনীয়।
বোন মারা যাওয়ার পর তিনি বারকয়েক টাকা তুলতে গিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে ফিরে আসেন। ব্যাঙ্ক কর্মকর্তারা বারবার তাকে জানান টাকা তুলতে গেলে অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিবারই ওই দরিদ্র কৃষক জানান যে তার বোন মারা গেছে কিন্তু কিছুতেই কর্তৃপক্ষ তারা তার কথা শোনেনি। শেষমেষ হতাশা তিনি এই চরম পদক্ষেপ নেন।
গতকাল উড়িষ্যার এক ব্যক্তি(জিতু মুন্ডা) তার মৃত বোনের (করলা মুন্ডা) কবর খনন করে তার কঙ্কাল তুলে নিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে সে মারা গেছে।
আমরা গর্ব করি, আমরা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের নাগরিক। কিন্তু সেই গর্বের মূল্য কতটা, যদি একজন মানুষকে নিজের প্রাপ্য সামান্য টাকা পেতে বোনের হাড় কাঁধে তুলে নিতে হয়??
এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়-আমাদের সিস্টেমে মানবিকতার চেয়ে কাগজের মূল্য বেশি, মানুষের যন্ত্রণার চেয়ে প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। গরিব মানুষের কণ্ঠ আজও ততটাই ক্ষীণ, যতটা আগে ছিল।
ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির আমানত ফেরতের ক্ষেত্রে নমনীয় পদ্ধতি অবলম্বন করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ছোট অঙ্কের টাকার ক্ষেত্রে যাতে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার না হন, তার জন্য নির্দিষ্ট 'ডেথ ক্লেইম সেটলমেন্ট' পদ্ধতি রয়েছে। তা সত্ত্বেও জিতু মুন্ডাকে কেন মৃত মানুষকে সশরীরে হাজির করার মতো অবাস্তব ও অমানবিক নির্দেশ দেওয়া হলো, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠছে। এটি কি কেবল নিম্নস্তরের কর্মীদের অজ্ঞতা, নাকি প্রান্তিক মানুষের প্রতি চূড়ান্ত অবজ্ঞা?
প্রশ্ন রয়ে যায়-জিতু মুন্ডার এই অপমানের দায় কার? মানুষ কতোটা অসহায় হলে মৃত বোনের কঙ্কাল তুলে আনতে বাধ্য হয় ??প্রতিদিন আমাদের দেশে এমন হাজার হাজার জিতু মুন্ডা নীরবে, নিভৃতে কতো না অপমান আর যন্ত্রণা সহ্য করে চলেছেন! এই ঘটনা প্রমাণ করে, গরিবের কণ্ঠ আজও নিভৃতেই রয়ে গেছে
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
2
Wow
0