একটা আইফোন এর কিস্তির জন্য পাহাড় থেকে পড়ে ঝড়ে গেলো তিনটি প্রাণ

মহারাষ্ট্রে আইফোনের কিস্তির টাকা নিয়ে পারিবারিক টানাপড়েনের জেরে ১৮ বছরের এক যুবক পাহাড়ে চলে যায়। তাকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান যুবক ও তাঁর বাবা-মা। ঘটনাটি পরিবার, সামাজিক মূল্যবোধ, সন্তানদের মানসিকতা ও শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

Aug 25, 2026 - 12:36
Aug 26, 2026 - 07:15
 0  1
একটা আইফোন এর কিস্তির জন্য পাহাড় থেকে পড়ে ঝড়ে গেলো তিনটি প্রাণ

সমাজ আজ কোথায়? সামাজিকতা আজ কোথায়? শিক্ষার কি এই অবস্থা?

আইফোনের কিস্তির টাকা দিতে না পারার অভিমান থেকে পাহাড়ে ১৮ বছরের যুবক—তাকে ফেরাতে গিয়ে প্রাণ গেল বাবা-মায়েরও

মহারাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে আমাদের সমাজ ও পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন। একটি আইফোনের কিস্তির টাকা দিতে না পারাকে কেন্দ্র করে ১৮ বছরের এক যুবক বাড়ি ছেড়ে পাহাড়ে চলে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও যখন বাড়ি ফেরানো সম্ভব হয়নি, তখন ছেলেকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান বাবা-মা ও ছেলে।

জানা গিয়েছে, মহারাষ্ট্রের তিসগাঁও এলাকার খাভদা পাহাড়ে চলে যায় ১৮ বছরের কুণাল। সকাল থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে পরিবারের সদস্য, গ্রামবাসী এবং পঞ্চায়েত প্রধান তাঁকে বাড়ি ফিরে আসার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন। বাবা-মাও ছেলেকে নানা ভাবে অনুরোধ করেন এবং জানান, তাঁর চাহিদা পূরণের জন্য তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

কিন্তু দীর্ঘ সময় বোঝানোর পরও কুণাল বাড়ি ফিরতে রাজি হয়নি বলে জানা যায়। একপর্যায়ে বাবা ছেলেকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে এগিয়ে গেলে দু’জনেই পাহাড়ের খাড়া অংশ থেকে পড়ে যান। ছেলেকে বিপদের মধ্যে দেখে মা-ও এগিয়ে যান এবং তিনিও দুর্ঘটনার শিকার হন।

একটি মোবাইল ফোনের কিস্তি—একটি পরিবারের কাছে যা হয়তো ছিল সামর্থ্যের বাইরে একটি আর্থিক চাপ, সেটিই শেষ পর্যন্ত এমন এক মর্মান্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে গেল, যা কোনো পরিবারই কামনা করতে পারে না।

সমাজ আজ কোথায়?

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের трагেডি নয়; আমাদের সমাজের সামনে একটি বড় প্রশ্নও তুলে ধরেছে।

আজকের দিনে সন্তানদের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিজেদের সামর্থ্যের সীমা অতিক্রম করছে। দামি মোবাইল, বাইক, পোশাক কিংবা বিভিন্ন বিলাসবহুল জিনিস অনেক সময় শিশু-কিশোরদের কাছে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে উঠছে সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক চাপের বিষয়।

সন্তানের আবদার পূরণ করতে না পারলে সে নিজেকে অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়া মনে করছে কি না—সেই বিষয়টিও আমাদের ভাবতে হবে।

সামাজিকতা আজ কোথায়?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একজন তরুণ যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তখন পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী ও সমাজের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

এই ঘটনায় পরিবার, গ্রামবাসী এবং পঞ্চায়েত প্রধান দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি আমাদের সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছি? তাদের চাহিদার পাশাপাশি তাদের হতাশা, অভিমান ও মানসিক অবস্থার কথাও কি শুনছি?

শুধু বিপদের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো নয়, বিপদ তৈরি হওয়ার আগেই সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি।

শিক্ষার কি এই অবস্থা?

শিক্ষা শুধু ভালো নম্বর পাওয়া বা বড় চাকরি পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা মানুষকে জীবনের মূল্য, ধৈর্য, সংযম, দায়িত্ববোধ এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়।

একটি মোবাইল ফোনের কিস্তি কখনোই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।

তাই পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজ—সবারই দায়িত্ব সন্তানদের শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, জীবনের শিক্ষাও দেওয়া। তাদের বোঝাতে হবে, সব চাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হয় না; প্রত্যাখ্যান মানেই জীবন শেষ নয়; আর সাময়িক কষ্ট কখনোই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হতে পারে না।

এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সকলের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

সন্তানের হাতে দামি ফোন দেওয়ার আগে তার হাতে মূল্যবোধ তুলে দিন।

সন্তানের চাহিদা পূরণের আগে তার মনের কথা শুনুন।

আর সন্তানকে শুধু সফল মানুষ নয়—একজন ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আইফোনের নয়।

প্রশ্নটা আমাদের সমাজের।

প্রশ্নটা আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধের।

প্রশ্নটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার।

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানদের মানুষ করে তুলছি?

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0
Atikul Alam সত্য চেপে রাখা যায় না